Skip to main content

অপরিণত


হন্তদন্ত হয়ে অফিস থেকে বেড়িয়েছি! এক প্রকার পালিয়েই এসেছি বলা চলে! আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার প্ল্যান! অটো টা ধরবো, লঞ্চ টা ধরবো, তারপর হাঁটা দিয়ে বাড়ি! সন্ধ্যেবেলা তেলেভাজা মুড়ি আর গরম চা! পুরো জমে যাবে!!

এমন সাত পাঁচ ভেবে যখন অটোয় উঠলাম, আমার অবস্থা তখন শোচনীয়! আশায় জল ঢেলে চালক বললে, এখনো 3 জন এলে তবে ছাড়বে! শনিবারের বাজার। মনে মনে ভগবানের পায়ে পড়ে গেলাম!আর তিনটেও যেন আমার মতোই ফাঁকিবাজ হয়! বসের চোখে ফাঁকি দিয়ে সুরুত করে সরে পড়ে! আমার সন্ধ্যে টা বেঁচে যায় তাহলে!

খানিকক্ষণ পরে একটি মেয়ে এসে বসলো আমার পাশে। আমি এমনিতে মার্কামারা! সে রূপে ঐশ্বর্যে হোক বা গন্ধে বর্ণে! তাই প্রেম ট্রেম এর সাথে আমার কস্মিনকালেও কোনো সম্পর্ক ছিল না!! তবু ভালো লাগলো। ওই বলে না, কি যেন, প্রথম দেখাতেই, কি যেন একটা...! 


কাটলো আরো মিনিট পনেরো। আর দুজন জুটলো না! অনেক পীড়াপীড়ি করার পর অবশেষে আমাদের দুজন কে নিয়েই অটোচালক রওনা দিলেন লঞ্চ ঘাটের পথে।

20 মিনিটের পথ। হাত গুনছি, গাঁট গুনছি, মোবাইল টিপছি, ইসপিশ করছি, কতক্ষণে যে পৌঁছাবে, কে জানে!! বাইরে ভালোই weather! বিকালবেলায় মেঘের আড়ালে বেশ অন্ধকার ভাব, আর একটা হিমেল হাওয়া! চোখ লেগে যাবার তাল! 

বেশ কিছুক্ষন এমনই কাটলো! আচমকা দেখি মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মাথা আমার কাঁধে! এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে আমি খুব কমই পড়েছি!! না পারছি সরাতে, আর না রাখতে সাহস পাচ্ছি! না জানি কত পরিশ্রম করে বেচারি বাড়ি ফিরছে! না হয় একটু ঘুমালই! কিন্তু আমার যে ওই মেয়ে মাত্রেই ভয়! আসে পাশের লোকে কি ভাববে, এই নিয়েই ভয়!! পাবলিক তো এমনিতে হাতা গুটিয়ে রেডিই থাকে! কিছু হলেই ভালো মন্দ চুলোয় যাক, আগে আমায় কেলিয়ে দলা পাকিয়ে ছাড়বে! মধ্যবৃত্ত বাঙালি! এর চেয়ে বেশি সাহস জুটবেই বা কোথা থেকে!!

মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর। বয়েসে আমার থেকে কিছুটা ছোট। তবে অল্প বয়সে চাপের ছাপ স্পষ্ট। চুল বিনুনি করে বাধার পরেও পিঠের নিচ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। মেকআপ এর তেমন বাহার নেই! হলদে রঙের একটা ডিজাইনার কুর্তি আর চুড়িদার। মানিয়েছে বেশ। ধকল গিয়েছে ভালোই! তাই সাত পাঁচ না ভেবেই কাঁধে মাথা রেখে দিব্বি ঘুমোচ্ছে।  আমিও যতটা সম্ভব স্থির থাকার চেষ্টা করলুম। যাতে ঘুমের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। 

এমনই হাজার হাজার প্ল্যানিং করতে করতে (আমরা চাকুরিজীবীরা ওটাই সবচেয়ে ভালো পারি!) লঞ্চ ঘাট এসে পড়লো! অটো টা আচমকাই ব্রেক কষতে মেয়েটির ঘুম ভাঙে। কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মেয়েটা। আলতো করে একটা সরি বলে কোনোক্রমে ভাড়া টা মিটিয়ে auto চালককে জিজ্ঞেস করে লঞ্চ ঘাটটা কোনদিকে। বলে দেবার পর মেয়েটি নেমে পড়ে। আমিও ভাড়া মিটিয়ে নেমে যাই।

মেয়েটা এই রুটে নতুন। কে যেন পিছন থেকে ঠিলেই পাঠালো আমায়! আগ বাড়িয়ে আমিই জিজ্ঞেস করলাম, 

যাবেন কোথায়?!
-হাওড়া যাবো। আপনি?
আমি সালকিয়ায়। 
-একই লঞ্চ এ যায়?
নাহ! আমার রুট আলাদা!
-আপনি কি এই রাস্তায় ডেলি প্যাসেঞ্জার?!
হ্যাঁ তা একপ্রকার! অফিস তাড়াতাড়ি ছুটি হলে এদিক দিয়েই ফিরি! আপনি এসেছিলেন কোথায়?!
-সল্ট লেক এ। একটা সরকারি কাজে। ফিরবো বর্ধমান। বললাম, ও, তাহলে তো রাত হয়ে যাবে ফিরতে! থাকেন কোথায় বর্ধমানে??! ...

... আরো মিনিট দুয়েক কথোপকথন চললো! তারপর আচমকাই বললো, কিছু মনে করলেন না তো? আপনার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম??! আসলে ভোর বেলা উঠেই বেরিয়ে পড়েছি। আর তারপর থেকে এই অফিস সেই অফিস করে বেড়াচ্ছি! 

আরে না না! মনে করার কি আছে! আমিও কতদিন ঘুমিয়ে পড়েছি ওমন!! 

বকতে বকতে লঞ্চ ঘাট এসে পড়লো! মেয়েটাকে টিকিট কাউন্টার দেখিয়ে দিয়ে আমি চলে গেলাম আমার লঞ্চ এর দিকে। 

জেটিতে দাঁড়িয়ে আছি। আবার দেখা হলো! মেয়েটি হাত নাড়িয়ে বললো, আসছি। বললাম হ্যাঁ!....

কিন্তু ওই পর্যন্তই!! মনের ভিতরে আরো অনেক কথা বলার বাকি রয়ে গেল!

ভেবেছিলাম অনেক কিছুই। কিন্তু মধ্যবিত্তের ভাবাই সার! নাম্বারখানাও নেওয়াই যেত! কিন্তু ওই, অহেতুক ভয়! আমার দ্বারা প্রেম ট্রেম হবে নাকো!! ভালো লাগাটুকু এমনিই পড়ে থাক! যদি কখনো আবার দেখা হয়ে যায় এমনই হন্তদন্তভাবে! হতেও পারে, সেদিন আমার সাহস বাড়িয়ে নাম্বারখানা নিয়েও নিলাম! 

Comments

Popular posts from this blog

নিছক স্মৃতি!

ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে আমরা এক রকমের মজাদার খাবারের আস্বাদ পেতাম!! আমরা ডাকতুম পচা আলুর বড়া!! নামে পচা হলেও স্বাদে সে খাসাই ছিল!! এই পচা আলুর, শহরের বাজারের পচা আলুর মতো ততটা বদনাম নয়! শহরে তো পচা মনে যথার্থই পচা!!গ্রামের বাড়িতে, ঘরের মেঝেতে চৌকির নীচে আলুর সাম্রাজ্য থেকে অচিরেই পচতে পারে, এমন সম্ভাবনাময় আলু শনাক্ত করে রান্নাঘরে বন্দি করে নিয়ে আসা হতো! তাকে পিষে আর বিভিন্ন উপকরণ (রান্নার ব্যাপারে আমি কিস্যু জানিনে। আমি খাদক মাত্র) মিলিয়ে অল্প তেলে ভেজে সে এক অসামান্য স্বাদ! নামটাই শুধু যা খারাপ!! আপত্তি নেই, স্বাদে গন্ধে সন্ধেবেলা গুলো অসাধারণ জমতো!! মাঝে মাঝেই হামলা চালাতুম ঘরের মেঝেয়! খুঁজে পেলেই মায়ের কাছে অনড় আবদার!  তো এই সেদিন ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো Smashed Potato Kebab!! দেখেই হঠাৎ মনে পড়লো, এ সেই আমাদের ছোটবেলার পচা! আধুনিকতার পাল্লায় পড়ে নামখানা ভালোই বাগিয়েছে!! তবে কিনা, আর পচা আলুর সেই সুখ্যাতি বাজারে নেই। এখন পচা মানে সত্যিই পচা। তাই টাটকা আলুতেই আপাতত মানিয়ে নিতে হয়েছে!! নাম বদলাতে পারে, স্বাদও কিছুটা বদলাতে পারে, কিন্তু স্মৃতিগুলো প্রায় বদলায় না! রেশটা ...